অক্ষয় মার্জিত

বৈতরণীর তীরে - দ্বিতীয় খণ্ড

বৈতরণী নদীর তীরের সেই ভয়াবহ রাত পেরিয়ে কদিন কেটে গেছে। প্রসাদ তার গ্রামে ফিরে এসেছিল, কিন্তু তার মন আর আগের মতো ছিল না। তার ঘাড়ের রহস্যময় পোড়া দাগটা প্রতিদিন বাড়তে শুরু করেছিল, যেন চামড়ার নিচে কেউ কয়লার আগুন জ্বেলে দিয়েছে। গ্রামের লোকেরা তাকে দেখে ফিসফিস করত, এড়িয়ে চলত। কেউ বলত সে অভিশপ্ত, কেউ বলত সে পিশাচের কবলে পড়েছে। এমনকি তার মাও তাকে একটু ভয়ের চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন। প্রসাদ অনুভব করত, কিছু একটা তাকে সবসময় ডাকছে। ওই নদীর তীরের কুয়াশা এবং অশরীরী আত্মাদের কান্নার শব্দ তার কানে ভেসে আসত। তার বাইকের চিন্তা তাকে অস্থির করে তুলছিল। দিনের বেলাতেও নদীর তীরে যেতে সে ভয় পেত, কিন্তু তার মন কিছুতেই শান্ত হচ্ছিল না। সে বুঝতে পারছিল, বাইক উদ্ধারের অজুহাতে তাকে আসলে ওই অশরীরীরা ডাকছে। তার কাছে তান্ত্রিকের দেওয়া কবজটা ছিল, কিন্তু তার শক্তি যেন কমে আসছিল। পরের দিন রাতে, এক অদ্ভুত তাগিদ অনুভব করে প্রসাদ আবার ওই পথে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার এক বন্ধু, সুদীপ, তাকে সাহায্য করতে রাজি হয়। "তুই একা যাচ্ছিস কেন? আমি তোর সাথে আসব," সুদীপ বলেছিল। কিন্তু প্রসাদ তাকে রাজি করায়নি। "না, সুদীপ। ওটা আমার দায়। তুই গেলে বিপদে পড়বি," প্রসাদ বলেছিল। রাতে ওই জায়গাটা আরও থমথমে এবং ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কুয়াশা এতটাই ঘন যে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। শুধু নদীর জলের মৃদু শব্দ এবং দূরে কোনো অজানা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। প্রসাদ তার বাইকটা দেখতে পায়। বাইকটা এখন আরও পুরোনো, জং ধরা এবং কাদা লেগেছিল। সে বাইকটা তুলতে যায়, কিন্তু অনুভব করে কেউ যেন তার হাত চেপে ধরেছে। সে পেছনে তাকাতেই দেখে, কোনো মানুষ নেই, কিন্তু কুয়াশার মধ্যে কিছু ছায়ামূর্তি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কুয়াশা থেকে এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছিল, "ফিরে এসেছিস... তুই আমাদেরই..." হঠাৎ তান্ত্রিক আবার আবির্ভূত হয়। কিন্তু এবার তার আচরণ ভিন্ন। সে প্রসাদকে বলে, "কবজটা কেবল সাময়িক সুরক্ষা দেয়। আসল উদ্দেশ্য হলো তোকে ওই আত্মাদের সঙ্গী করা। তোর ঘাড়ের দাগটা একটা অভিশাপের চিহ্ন। এই অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় তোকে নিজেই খুঁজে বের করতে হবে।" তান্ত্রিকের চোখ দুটো ছিল উজ্জ্বল এবং রহস্যময়। তান্ত্রিক এবং আত্মাদের মধ্যে এক অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়। আত্মারা প্রসাদকে তাদের সঙ্গী করতে চায়। তারা প্রসাদের ঘাড়ে স্পর্শ করে। প্রসাদ অনুভব করে তার আত্মা শরীর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তান্ত্রিক প্রসাদকে বাঁচাতে তার নিজের জীবন বাজি রাখে। সে প্রসাদকে এক ভয়ংকর মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে যেতে বলে। মন্ত্রপাঠের ফলে আত্মারা একটু পিছিয়ে যায়। তান্ত্রিক প্রসাদকে বলে, "পালা! আর পেছনে তাকাবি না। কবজটা এই অভিশাপের চিহ্নটা তোর থেকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু তোর পুরো জীবন বদলে যাবে।" প্রসাদ মন্ত্রের শক্তি অনুভব করে এবং অন্ধের মতো দৌড়াতে শুরু করে। সে পেছনে না তাকিয়ে দৌড়ায়। পেছনে কান্নার শব্দ, হাসির শব্দ এবং অদ্ভুত গর্জন শোনা যাচ্ছিল। প্রসাদ পালাতে পারে, কিন্তু তান্ত্রিক নিখোঁজ হয়। প্রসাদের ঘাড়ের দাগটা একটু কমে, কিন্তু পুরোপুরি যায় না। সে সারাজীবনের জন্য ওই রাতের ভয় মনে রাখে। তার জীবন আর আগের মতো হয় না। সে আর কখনো ওই বৈতরণী নদীর তীরের দিকে যায় না। কিন্তু ওই রাতের ভয়ংকর স্মৃতি তার জীবনে চিরকাল রয়ে যায়।
🔖 সংরক্ষণ ❤️ 0 পছন্দ 💬 0 মন্তব্য

মন্তব্য ও পছন্দ করতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!