অক্ষয় মার্জিত

বৈতরণীর তীরে

অমাবস্যার রাত। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় তিনটে ছুঁইছুঁই। ঘন কুয়াশায় চারপাশটা এমনভাবে ঢেকে আছে যে দশ হাত দূরের জিনিসও ঠাহর করা যাচ্ছে না। প্রসাদের পুরনো এনফিল্ড বাইকটা এই নিস্তব্ধ মেঠো পথ চিরে এগিয়ে চলেছে। আজ শহরে কাজ মেটাতে বড্ড দেরি হয়ে গেল। বাড়ি ফেরার এই একটাই শর্টকাট রাস্তা, যেটা সোজা বৈতরণী নদীর ধার ঘেঁষে রসুলপুর গ্রামের দিকে গেছে। গ্রামের বয়স্করা বলেন, রাতের অন্ধকারে এই নদীপথে আত্মারা পারাপার করে। কিন্তু প্রসাদ এসব ভূত-প্রেত বিশ্বাস করে না। অন্তত, আজ রাতের আগে পর্যন্ত করত না। নদীর কাছাকাছি আসতেই বাইকের হেডলাইটের আলোটা হঠাৎ করেই যেন ম্লান হয়ে আসতে শুরু করল। চারপাশের চেনা বুনো গন্ধটা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। তার বদলে নাকে এসে ধাক্কা মারল একটা স্যাঁতস্যাঁতে, পচা গন্ধ, যার সাথে মিশে আছে ধুনো আর পোড়া মাংসের তীব্র উৎকট গন্ধ। প্রসাদের বুকটা একবার ছ্যাঁত করে উঠল। হঠাৎ ইঞ্জিনটা একটা বিকট খকখক শব্দ করে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। প্রসাদ বাইক থেকে নেমে কিক মারার চেষ্টা করল, কিন্তু ইঞ্জিন সম্পূর্ণ মৃত। চারপাশটা যেন অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁপোকার ডাক পর্যন্ত নেই। শুধু নদীর কালো জল থেকে একটানা একটা 'ছলাৎ... ছলাৎ...' শব্দ ভেসে আসছে। কুয়াশার চাদরটা হঠাৎ একটু সরে যেতেই প্রসাদের চোখ গেল নদীর মাঝখানের দিকে। সেখানে একটা পুরোনো, জীর্ণ কাঠের নৌকো ভাসছে। নৌকোর গলুইয়ে একটা টিমটিমে আলো জ্বলছে, কিন্তু সেই আলোর রঙ হলুদ নয়, একটা অস্বাভাবিক নীলচে আভা ছড়াচ্ছে চারদিকে। নৌকোতে কোনো মাঝি নেই, কিন্তু হাল ধরে বসে আছে এক বিশাল দীর্ঘকায় ছায়ামূর্তি, যার মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটা কালো কাপড়ে ঢাকা। হঠাৎ নদীর তীরের দিক থেকে একটা চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। প্রসাদ চমকে সেদিকে তাকাতেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা বরফ-শীতল স্রোত নেমে গেল। সে দেখল, কুয়াশা ফুঁড়ে নদীর হাঁটুজল দিয়ে সারিসারি মানুষ হেঁটে নৌকোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের হাঁটার ভঙ্গি স্বাভাবিক নয়। তাদের পা জলের ওপর পড়ছে ঠিকই, কিন্তু কোনো শব্দ হচ্ছে না। জলের বুকে কোনো ঢেউ উঠছে না। তাদের প্রত্যেকের মাথা বুকের কাছে ঝোলানো। প্রসাদের মনে হলো সে যেন পাথর হয়ে গেছে। তার পা দুটো মাটির সাথে সেঁটে গেছে, চাইলেও এক পা নড়তে পারছে না। ঠিক সেই মুহূর্তে সারির একেবারে শেষে থাকা মূর্তিটা হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে সে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রসাদের দিকে তাকাল। লোকটার মুখের অর্ধেকটা আগুনে ঝলসানো, আর চোখের কোটরে কোনো মণি নেই—শুধু দুটো সাদা, ঘোলাটে গর্ত প্রসাদের দিকে স্থির হয়ে আছে। মূর্তিটা ধীরে ধীরে তার একটা হাত প্রসাদের দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপর একটা খসখসে, অমানুষিক গলা প্রসাদের কানের একেবারে কাছে ফিসফিস করে উঠল— "প্রসাদ... অনেকদিন পর এলি যে... আয়, নৌকো ছাড়ার সময় হয়ে এল। তোর জন্য একটা জায়গা ফাঁকা রেখেছি..." প্রসাদ অনুভব করল, তার বাঁ কাঁধের ওপর একটা বরফের মতো ঠান্ডা, শক্ত হাত এসে পড়েছে। হাতের লম্বা, সরু নখগুলো তার চামড়া ফুঁড়ে ভেতরে ঢুকে যেতে চাইছে। তীব্র এক আতঙ্কে প্রসাদের গলা চিরে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। সে এক ঝটকায় কাঁধের ওপরের সেই অদৃশ্য হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বাইক ফেলেই অন্ধের মতো উল্টোদিকে দৌড় লাগাল। পেছনে তখন অজস্র মানুষের ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দ আর জলের প্রবল আলোড়ন। প্রসাদ একবারও পেছনে তাকায়নি। দৌড়াতে দৌড়াতে সে সোজা গ্রামের শিব মন্দিরের চাতালে এসে আছড়ে পড়ে জ্ঞান হারায়। পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা তাকে উদ্ধার করে। টানা সাতদিন প্রচণ্ড জ্বরে ঘোরে প্রলাপ বকেছিল প্রসাদ। বাইকটা নদীর ধার থেকে পাওয়া গেলেও, প্রসাদের বাঁ কাঁধে পাঁচটা আঙুলের কালো পোড়া দাগটা চিরকালের মতো বসে গিয়েছিল। আজও রাতের বেলা দূর থেকে কোনো নদীর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শুনলে প্রসাদের বাঁ কাঁধের সেই পোড়া দাগটা দপদপ করে ওঠে, আর সে নিজের ঘরের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে।
🔖 সংরক্ষণ ❤️ 0 পছন্দ 💬 0 মন্তব্য

মন্তব্য ও পছন্দ করতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ (0)

কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!